একটা গল্প দিয়ে শুরু করি।

বছর দশেক আগে ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে শখের বশে পোশাক ডিজাইনিং শুরু করেছিলেন জিলন  মাস্ক । নিজস্ব শেকড়ের ঐতিহ্যের সাথে মডার্ন আর্ট মিশিয়ে পোশাক ডিজাইন করতেন তিনি। জনপ্রিয়তার হাত ধরে বক্কর  মার্কেটে সাতজন কর্মচারীর একটা দোকান দিয়েছেন সম্প্রতি।

শুভাকাঙ্ক্ষীরা খুব করে বলেন, প্রযুক্তির এই যুগে একটা ওয়েবসাইট না থাকলেই নয়। জিলন  মাস্ক খোঁজখবর নিয়ে একজন ওয়েব ডেভেলপার নিযুক্ত করলেন। দক্ষ ডেভেলপার কয়েকদিনের মাঝে ঝকঝকে একটা ওয়েবসাইট তৈরী করে দিলেন জিলন  মাস্ক এর  ব্র্যান্ডের। এর পরেই শুরু হলো আসল খেলা। সুন্দর ওয়েবসাইটটা দ্রুতই জনপ্রিয়তা পেল। ইন্টারনেটে জিলন মাস্ক এর  পোশাক অনেক মানুষ পছন্দ করলো। ব্যবসা নতুন গতি পেল। জিলন  মাস্ক ভাবলেন, ওয়েব ডেভেলপার হায়ার করে কী ভালো কাজটাই না  করেছিলাম!

নিজের প্রতিষ্ঠানের এই ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজটি জিলন  মাস্ক কিংবা তার কর্মচারীদের কেউ করতে পারতেননা। প্রতিষ্ঠানের বাইরের একজনের মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করিয়ে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে বিজয় যেটি করেছেন, সেটি হলো আউটসোর্সিং।

কী, গল্পে গল্পে আউটসোর্সিং ব্যপারটা একটু হলেও বোঝা গেল তো? আজকে আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আউটসোর্সিং কি থেকে শুরু করে -এর একদম আদ্যোপান্ত জেনে নেয়া। আউটসোর্সিং নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা, আউটসোর্সিং এর গুরুত্ব, সুবিধা-অসুবিধা, প্রকারভেদ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং কীভাবে আউটসোর্সিং করবো – কিছুই বাদ যাবেনা এই লেখায়।

গল্প শেষ বলে দৌড় দিওনা আবার! ধৈর্য ধরে পুরোটা পড়ে নাও একবার। আমি এইটুকু কথা দিতেই পারি, আউটসোর্সিং নিয়ে সম্যক একটা ধারণা পেয়ে যাবে এই লেখাটা পড়ে।

আউটসোর্সিং কি – What is Outsourcing in Bengal

আউটসোর্সিং শব্দটি এসেছে আউটসাইড আর রিসোর্সিং এই দুই শব্দের মিশেলে। অর্থাৎ বাইরে থেকে রিসোর্স এনে ব্যবহার করা। এটি মূলত এক বিশেষ বিজনেস স্ট্র্যাটেজি যার দ্বারা কোনো কোম্পানি তাদের কোনো কাজ নিজেদের কলেবরের বাইরের কোনো সোর্স থেকে  করিয়ে নেয়। আইবিএমের মতে, আউটসোর্সিং এর এই ধারণাটা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে, এরপর থেকে পুরো ৯০ এর দশক জুড়েই এটি ব্যবহৃত হতে থাকে। আর বর্তমানে আউটসোর্সিং অনেক বেশি প্রচলিত ও জনপ্রিয় একটা বিজনেস স্ট্র্যাটেজি।

কোনো সেবা প্রদানে কিংবা পণ্য তৈরিতে কোম্পানির বাইরের কাউকে নিযুক্ত করার বিষয়কে আউটসোর্সিং বলা হয়। অর্থাৎ কোনো কাজ সম্পাদনে কোনো কোম্পানির প্রয়োজনীয় লোকবল বা দক্ষতা না থাকলে সেক্ষেত্রে কোম্পানির কর্মচারী নয়, এমন কাউকে শুধুমাত্র উক্ত কাজ সম্পাদনে ভাড়া করার ব্যাপারকে বলা হয় আউটসোর্সিং।

আউটসোর্সিং আর ফ্রিল্যান্সিং কি এক?

আউটসোর্সিং নিয়ে অনেক প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা আছে। অনেকে ফ্রিল্যান্সিং আর আউটসোর্সিং কে গুলিয়ে ফেলেন। অথচ আউটসোর্সিং আর ফ্রিল্যান্সিং একটা আরেকটার বিপরীত। বলা যায়, পয়সার এপিঠ-ওপিঠ। উপরের জিলন মাস্ক এর  উদাহারণ আবার টেনে আনা যাক। তিনি তার একটা কাজ বাইরের একজন দক্ষ ব্যক্তির থেকে করে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি যেটা করেছেন সেটা আউটসোর্সিং। আর যেই ডেভেলপার  জিলন মাস্ক এর ওয়েবসাইটটি চুক্তির ভিত্তিতে তৈরী করে দিয়েছেন, তিনি একজন ফ্রিল্যান্সার।

যিনি কাজ করিয়ে নেন, তিনি করেন আউটসোর্সিং। আর যিনি কাজটা করেন, তিনি করেন ফ্রিল্যান্সিং। 

আউটসোর্সিং এর উপকারী দিক

ভেবে-চিন্তে আউটসোর্স করলে সাধারণের চেয়ে অনেক কম খরচে একই সার্ভিস পাওয়া যায়। যেমন, আমেরিকা বা ইয়োরোপের একজন কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারের বেতন আর বাংলাদেশ বা এশিয়ার কোনো দেশের ইঞ্জিনিয়ারের থেকে অনেক বেশি, যদিও তারা প্রায় সমান দক্ষ হন। এর কারণ আমেরিকার একটা শহরে বসবাস করা একটা এশীয় দেশে বসবাস করার থেকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল।  তাই বেশি উন্নত দেশগুলো তাদের কাজগুলো আমাদের মত স্বল্পোন্নত দেশের লোকবল দিয়ে তুলনামূলক কম খরচে করিয়ে নিতে পারে।

এফিসিয়েন্সি বাড়ে

৯টা-৫টা অফিস করার ঝক্কি ঝামেলা নেই, ক্ষেত্রবিশেষে চাকরিজীবী তার ঘরে বসেই কাজ করতে পারেন। আর চাপমুক্ত পরিবেশের কাজ যে স্বাভাবিকের থেকে বেশি নিখুঁত হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।  কাজের দক্ষতা থাকলে স্থান-কাল যে সমস্যা হয় না সেটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো আউটসোর্সিং।

পাশাপাশি আউটসোর্সাররা তাদের কাজের প্রয়োজনমতো সুনির্দিষ্ট দক্ষ লোকদেরকেই হায়ার করতে পারে। যাচাই-বাছাই করাটাও বেশি সময়সাপেক্ষ না। এখানে একটা উইন উইন সিচুয়েশন তৈরী হয়, ফলে কাজের মান স্বভাবতই উন্নত হয়।

স্পেশালাইজেশনে ফোকাস করা যায়

যেহেতু আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের বিশেষ একেকটা অংশ বাইরের একেক জায়গা থেকে করিয়ে নেয়, তাই তাদের কাজ করে দেয়া ফ্রিল্যান্সাররাও খুব দায়িত্ব নিয়ে নির্দিষ্ট কাজটি শেষ করে। ওই ছোট অংশেই ফ্রিল্যান্সারের অনেক বেশি দক্ষতা থাকা, আর শুধু ওইটুকুতে মনোযোগ দেবার কারণে কাজটি সুন্দর হয়।

অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সুবিধা মেলে

একটা নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ একজন ফ্রিল্যান্সারের ওই কাজের জন্য বিশেষায়িত একটা সেটাপ থাকে। নিজের কাছে থাকা প্রযুক্তি দিয়েই ফ্রিল্যান্সার কাজটি করে থাকেন। ফলে আউটসোর্সারের আলাদা করে প্রযুক্তি কেনার জন্য খরচ করতে হয়না, ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে তুলতে হয় না।

যেহেতু বাইরে থেকেই অনলাইনেই ফ্রিল্যান্সাররা কাজ করতে পারেন, তাই মেইন্টেইনেন্স খরচও বাঁচে। সাথে নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে কাজ করতে করতে দুইপক্ষই বিভিন্ন প্রযুক্তির সংস্পর্শে আস,  প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নত হয়।

টাইম জোনগত সুবিধা হয় এবং কাজের গতি বাড়ে

আলাদা টাইম জোনে থাকলে আমরা শুধু ভাবি অসুবিধা হয়, কিন্তু অপরদিকে সুবিধাও কিন্তু আছে! যেমন, আউটসোর্সার  কোম্পানি তার ফ্রিল্যান্সারকে কাজ দিয়ে অফিস শেষ করলো, এবং পরদিন সকালে এসেই হয়তো দেখলো কাজ একদম রেডি! কারণ যাকে কাজটি দেয়া হয়েছে, তার টাইম জোনে কাজ করার জন্য উপযুক্ত সময় তখন, যখন আউটসোর্সার ঘুমাচ্ছে। মজার ব্যপার না? প্রচলিত অফিসের ধারায় এমনটা সম্ভব নয়। এতে কাজের গতি যেমন বাড়লো, স্কেল আপও হলো!

আউটসোর্সিং এর অসুবিধাসমূহ কি?

  1. আপনার প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন হওয়ার কোনো গ্যারান্টি নেই। একজন ফ্রিল্যান্সার উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে কোনো কাজ প্রত্যাখ্যান করে দিতে পারেন।
  2. আউটসোর্সিং এর ক্ষেত্রে প্রতিবার কাজের মান আপনার আশানুরূপ না ও হতে পারে।
  3. কোনো কাজ সম্পাদনে সাধারণ উপায়ের চেয়ে আউটসোর্সিং এর ক্ষেত্রে অধিক সময় লাগতে পারে।

আউটসোর্সিং এর প্রকারভেদ

গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কাস্টমার সার্ভিস, কপিরাইটিং, ডিজাইন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং, মার্কেটিং ও সেলস, অ্যাকাউন্টিং এবং বুককিপিং সহ অগণিত কাজ করা হয় প্রচলিত আউটসোর্সিং এ।

আউটসোর্সিংকে আলোচনার সুবিধার্থে কয়েকভাগে বিভক্ত করা হয়:

ইঞ্জিনিয়ারিং প্রসেস আউটসোর্সিং:

এক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের কিছু কাজ বাইরে থেকে করিয়ে নেয়া হয়। উদাহরণস্বরুপ, কিছু অটোমোটিভ কোম্পানি তাদের প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও মেইন্টেনেন্স এর কাজ করিয়ে থাকে।

ইনফরমেশন টেকনোলজি আউটসোর্সিং:

কিছু কোম্পানি চায়ই তাদের এক্সটারনাল আইটি সাপোর্ট থাকুক, সেক্ষেত্রে তারা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, টেলিকমিউনিকেশনস, টেকনিক্যাল সাপোর্ট এজাতীয় কাজ আউটসোর্স করায়।

নলেজ প্রসেস আউটসোর্সিং:

এর মাঝে পড়ে বুক কিপিং, ডেটা এন্ট্রি, মার্কেট রিসার্চ, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রিসার্চ, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন ইত্যাদি বিষয়। কেউ চাইলে এগুলোও আউটসোর্স করতে পারে।

লিগ্যাল প্রসেস আউটসোর্সিং:

সব কোম্পানিরই কিন্তু ল-ইয়ার থাকে না, কিন্তু লিগ্যাল কাজবাজ তো সকলেরই দরকার। এখানেই কাজে দেয় আমাদের আউটসোর্সিং নামক জাদুর বাক্স।

রিক্রুটমেন্ট প্রসেস আউটসোর্সিং:

কোনো প্রতিষ্ঠানে লোক নিতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, যারা কিনা সুচারুভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারবে। কোনো স্বজনপ্রীতি ছাড়াই সুন্দর ভাবে পুরোটা ম্যানেজ করতেও লোকবল আউটসোর্স করা হয়ে থাকে।

হিউম্যান রিসোর্স আউটসোর্সিং:

যেকোনো প্রতিষ্ঠান নির্বিঘ্নে ছলতে হলেই দরকার সেই প্রতিষ্ঠানের মানুষগুলোর নিজেদের মধ্যে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি করা, এবং বজায় রাখা। সেটি দেখার দায়িত্বে থাকে এইচআর টিম। এই হিউম্যান রিসোর্স অন্যতম জরুরি এক খাত আউটসোর্স করার জন্য।

আউটসোর্সিং এর ভবিষ্যৎ কি

আউটসোর্সিং এর এই ইন্ডাস্ট্রি কি আগামীতে টিকে থাকবে? এর উত্তর হ্যাঁ! কারণ, এতে উভয় পক্ষই সাধারণের চেয়ে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। একদিকে ইন্ডাস্ট্রি লেভেলে কর্পোরেট হাবগুলো তাদের কাজের জন্য দক্ষ, যোগ্য মানুষ হায়ার করতে পারছে, অপরদিকে বিশেষায়িত স্কিলসম্পন্ন ব্যক্তিও সহজেই তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পেয়ে যাচ্ছে।

আউটসোর্সারের সময় বাঁচছে, খরচ কমছে, আর সে নিখুঁত কাজ পাচ্ছে। আর এদিকে ফ্র্যিল্যান্সার ঘরের কোণে কিম্বা গ্রামের বাড়ির পুকুরপাড়ে বসেই তার কাজের মাধ্যমে সম্মানজনক স্যালারির জব করতে পারছে। দুই পক্ষ লাভবান হবার পাশাপাশি অনেক রিসোর্স ও বেঁচে যাচ্ছে।

সব বিবেচনা করে অভিজ্ঞদের মতামত, আউটসোর্সিং এর ভালো দিকগুলোর কারণে দিনদিন আরো বেশি প্রচলিত হতে থাকবে।

By Jillu Miah

আমি জিল্লু মিয়া। আমি একজন ডিজিটাল মার্কেটার এবং এসিও বিশেষজ্ঞ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *